পুজোর পাস বিলি মামলায় বুধবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজিরা দিতে যান চন্দননগরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ইন্দ্রনীল সেন। দফতরের বাইরে মোতায়েন ছিল বিপুল পুলিশবাহিনী। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরোতেই তাঁকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, পরে তাঁকে গ্রেফতার করে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি পুলিশের।
ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারি নিয়ে নবান্নে প্রতিক্রিয়া জানালেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ইডি ও কলকাতা পুলিশ দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছিল এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলি নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে বলেই আইনানুগ পদক্ষেপ করেছে।
একই সঙ্গে শুভেন্দুর দাবি, এই ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর কথায়, “আমি বহু রাজনৈতিক সভায় বলেছি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ মদতেই এসব হয়েছে। একা তো খাননি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরও ভাগ থাকতে পারে।”
- আরও পড়ুন — বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের মডেলে ভারতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চক্রান্ত! রাহুল ও তরুণ নেতাদের বিঁধলেন রাজনাথ!
ইন্দ্রনীল ও মমতার ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, “ইন্দ্রনীল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই গাড়িতে ঘুরতেন, একসঙ্গে গানও গাইতেন। তাঁদের শেষ ডুয়েট ছিল, ‘আমার যাওয়ার সময় হল, দাও বিদায়…’।”
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। শুভেন্দুর মন্তব্য, “আগে সিপিএমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরে সময়ের সঙ্গে রং বদলেছেন। পরিবর্তনের পর সরকারের প্রশংসাও করেছেন। তবে বিজেপিতে এ ধরনের রাজনীতির জায়গা নেই।”
একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইন্দ্রনীল সেনকে কটাক্ষ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “দু’জন একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। আজ তারই পরিণতি দেখা যাচ্ছে। এটা তো সবে শুরু, এখনও অনেক কিছু বাকি রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে জড়িতদের প্রত্যেককেই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সময় এলে বড় বড় মাথার বিরুদ্ধেও তদন্তের হাত পৌঁছবে।”
রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই মামলায় এর আগেও তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইডি। পাশাপাশি তাঁর একাধিক ঠিকানায় তল্লাশিও চালানো হয়েছিল। দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজো পর্ব শেষ হওয়ার পর ফের তাঁকে তলব করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সেই নির্দেশ মেনে বুধবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজিরা দেন ইন্দ্রনীল।
ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে পুজোর পাস সংক্রান্ত দুর্নীতির মূল অভিযোগটি প্রথমে দায়ের হয়েছিল কলকাতা পুলিশের কাছে। জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি বৌবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে একই মামলায় তদন্তে নামে ইডিও।
বুধবার ইডির তলবে সাড়া দিয়ে সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে যান ইন্দ্রনীল। এদিন তাঁর উপস্থিতির কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌঁছে যান কলকাতা পুলিশের একাধিক আধিকারিক। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই জল্পনা তীব্র হয় যে, প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারির পদক্ষেপ করা হতে পারে। পরে সেই জল্পনাই বাস্তবে পরিণত হয় বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
ইডি ও কলকাতা পুলিশের তদন্তের মাঝেই আগাম জামিনের আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। তবে হাই কোর্টে তাঁর সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত শীর্ষ আদালতের কোনও চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়নি।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে ইন্দ্রনীলের মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চে মামলাটি উঠলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে শুনানি থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে মামলার পরবর্তী শুনানি ও নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা আইনি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর গত ১১ মে পুরনিয়োগ মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। সেই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই বুধবার গ্রেফতার হলেন তৃণমূল জমানার আরও এক প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। ফলে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতি সংক্রান্ত তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


