আজ সোমবার ছিলো বিজেপির জনমানুষের সরকারের প্রথম কর্মদিবস। আর এই প্রথম দিনেই মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে পুরো ছক্কা হাঁকালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ! সরকারি চাকরির পরীক্ষায় আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি আরও জানান, বর্তমানে চালু থাকা কোনও সামাজিক প্রকল্প বন্ধ হবে না এবং প্রতিটি প্রকল্প স্বচ্ছভাবে চলবে।
সোমবার দুপুর ১২টায় নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন শুভেন্দু। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু ও নিশীথ প্রামাণিক। মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা এবং প্রশাসনিক আধিকারিকেরাও ছিলেন সেখানে। প্রথম বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, তাঁর মন্ত্রিসভা সুশাসন ও সুরক্ষার পথে চলবে। পাশাপাশি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলির ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ যেভাবে এগোচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গও সেই পথেই এগোবে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই সরকার ‘ফর দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি, অফ দ্য পার্টি’ পদ্ধতি বাদ দিয়ে বাবাসাহেব অম্বেডকরের ‘বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’ ভিত্তিতে চলবে।”
এবারের ভোট প্রচারে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বারবার সরব হয়েছে বিজেপি। ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশ রুখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন দলের নেতারা। আর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বিএসএফ-কে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল শুভেন্দু সরকার। সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-কে জমি দেওয়া হবে। শুভেন্দু জানান, “রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গেছে। প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর ও বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” আসলে, এই জমি নিয়ে আগের রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের টানাপোড়েন চলছিল।
রাজ্যে ক্ষমতায় এলে কর্মসংস্থান নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দিয়েছিল বিজেপি। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই তার প্রতিফলন দেখা গেল বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি চাকরির আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে কোনও নিয়োগ হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষিত যুবক-যুবতী চাকরির আবেদনের বয়সসীমা অতিক্রম করেছিলেন। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু।

পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগ পূর্বতন সরকারের আমলে বহুবার উঠেছে। তখন প্রকল্পের নামবদল নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। এবার বিজেপি সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে রাজ্যকে যুক্ত করার ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, “মোদীজি বলেছিলেন, প্রথম ক্যাবিনেটে আমরা আয়ুষ্মান ভারতে যুক্ত হব। আমরা আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় যুক্ত হলাম। এ সংক্রান্ত চুক্তি ও অন্যান্য বিষয় স্বাস্থ্যসচিব, মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের উপদেষ্টা ও মুখ্যসচিব দ্রুত সম্পন্ন করবেন।” পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা, পিএমশ্রী, বিশ্বকর্মা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, উজ্জ্বলা যোজনা-সহ নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। জেলা প্রশাসকদের দ্রুত আবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে।
শুভেন্দু জানান, এত দিন পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সোমবার থেকে এই আইন রাজ্যে কার্যকর হচ্ছে। তাঁর কথায়, “অত্যন্ত অবৈধভাবে সংবিধানকে উপেক্ষা করে আগের সিআরপিসি, আইপিসি চালু ছিল। আজ থেকে পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হল বিএনএস-এ।” প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজ্যের আইএএস, আইপিএস, ডব্লিউবিসিএস, ডব্লিউবিপিএস আধিকারিকদের নিয়ম মেনে কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণের বিষয়েও মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়। শুভেন্দু আরও বলেন,পূর্বে মমতার অলিখিত নির্দেশে কেউ কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশিক্ষণে যোগ দিতেন ন। এবার অন্য রাজ্যের নিয়ম মেনে চলার জন্য মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব বিশেষ দেওয়া হল।”
পাশাপাশি রাজ্যে মৃত্যুহীন, ভয়মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের জন্য রাজ্যের ভোটার, নির্বাচন কমিশন, রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, ভোটকর্মী, ভিন্রাজ্য থেকে আসা পর্যবেক্ষক এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রার্থী-সহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যাঁদের আত্মবলিদানে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই ৩২১ জন বিজেপি কর্মীর আত্মবলিদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছি। তাঁদের পরিবারের প্রতি এই সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা যেমন হত্যার বিচার আশা করে, তা আমরা দেব। তাদের সামাজিক ও অন্যান্য কল্যাণমূলক দায়দায়িত্বও এই সরকার নিজেদের কাঁধে তুলে নিল।”
মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত বছরের জুন মাসে কেন্দ্রীয় সরকার জনগণনা সংক্রান্ত একটি নির্দেশ পাঠিয়েছিল রাজ্য সরকারকে। তিনি বলেন, “প্রায় এক বছর হয়ে গেল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ফাইলটি অবহেলায় ফেলে রেখেছিল। এগুলো এখন প্রকাশ করার বিষয় নয়। তবে লিখিত তথ্য অনুযায়ী, তারা শুধু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই নয়, দেশের ও সংবিধানের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারত সরকারকে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করা থেকে বিরত রাখা। আজ আমরা জনগণনা সম্পর্কিত সার্কুলার কার্যকর করলাম।”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সরকার চলে তথ্য ও নিয়মের ভিত্তিতে। সরকারি সিদ্ধান্ত গঠিত হয় সংবিধানের নানা বিষয়ের উপর। এই সরকার ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং ‘আমরা’-নীতিতে চলবে। সংবিধানকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করব। আশা করি, এই সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচকেরাও সমালোচনার সুযোগ পাবেন না। এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে সরকার, ভরসা রাখুন।” শুভেন্দু জানান, আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার পরবর্তী বৈঠক হবে। সেখানে আরজি করের ঘটনা, নারী নির্যাতন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বেতন কমিশন এবং মহার্ঘ ভাতা সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হবে।


