ভোটার তালিকায় এত নাম এল কোথা থেকে, আর গেলই বা কোথায়? SIR-এর খসড়া তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই মহারাষ্ট্র থেকে কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা—একাধিক রাজ্যে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশন তৃতীয় দফার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা এসআইআরের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৬ কোটি ১৫ লক্ষ মানুষের নাম! গত তিন বছরে যেখানে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, সেই পাঁচ রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম কাটা পড়েছে—মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, দিল্লি ও অন্ধ্রপ্রদেশ। শতাংশের হিসাবে একই চিত্র দেখা গিয়েছে। দিল্লিতে সবচেয়ে বেশি ৩২.৭৮ শতাংশ নাম বাদ, দ্বিতীয় স্থানে দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ (২৯.৬৫ শতাংশ), তৃতীয় তেলেঙ্গানা (২১.৬৯ শতাংশ), চতুর্থ মহারাষ্ট্র (২১.১৪ শতাংশ) এবং পঞ্চম কর্ণাটক (১৯.৪৮ শতাংশ)।
২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে যত ভোট পড়েছিল, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের নামই SIR-এর খসড়া তালিকায় নেই বলে দাবি করা হচ্ছে। কর্ণাটকে পরিস্থিতি আরও চমকপ্রদ—২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যত ভোট পড়েছিল, তার প্রায় অর্ধেক ভোটারের নাম খসড়া তালিকায় নেই। তেলেঙ্গানাতেও একই ছবি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে দাবি।
আর এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে এতদিন যে ভোটার তালিকা ধরে নির্বাচন হয়েছে, তার বৈধতা কতটা?
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন কুরেশির
SIR-এর এই প্রক্রিয়া নিয়ে সরব হয়েছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়া কিংবা নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়ায় সেই স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলেই তাঁর অভিযোগ।
মহারাষ্ট্রে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ
মহারাষ্ট্রের ভোটার তালিকা নিয়ে আগে থেকেই সরব বিরোধীরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতা ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ করেছিলেন।
তাঁদের দাবি, ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের মধ্যে মহারাষ্ট্রে প্রায় ৩২ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যুক্ত হয়েছিল। এরপর লোকসভা নির্বাচন থেকে বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে আরও প্রায় ৩৯ লক্ষ নাম যোগ করা হয়।
‘তাহলে কোন তালিকাটি ঠিক?’
মহারাষ্ট্রের SIR-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ফের সরব হন রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি ৩৯ লক্ষ। কয়েক মাস পর বিধানসভা নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৭০ লক্ষে।
কিন্তু ২০২৬ সালের SIR-এর খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৭ কোটি ৭৮ লক্ষে।
রাহুলের প্রশ্ন—“তাহলে কোন তালিকাটি ঠিক?”
তাঁর দাবি, SIR-এর খসড়ায় মহারাষ্ট্রে প্রায় ২ কোটি ৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। অর্থাৎ, তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন ভোটারের মধ্যে প্রায় একজনের নাম বাদ!
এই পরিসংখ্যান সামনে রেখে রাহুল ফের তাঁর পুরনো অভিযোগই তুলেছেন—“ভোট চুরি হয়েছে।”
মণিপুরেও প্রকাশ চূড়ান্ত তালিকা
এদিকে জাতিগত সংঘর্ষে দীর্ঘদিন ধরে বিধ্বস্ত মণিপুরে প্রকাশিত হয়েছে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। সেখানে মোট প্রায় ১৯ লক্ষ ৬০ হাজার ভোটারের নাম রয়েছে।
SIR-এর খসড়া তালিকায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার দাবি ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এগুলি কি শুধুই তালিকা সংশোধনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনও গরমিল? প্রশ্নের উত্তর মিলবে চূড়ান্ত তালিকা এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যাতেই।


